গ্লোবাল টিভির হেড অব নিউজ নাজনীন মুন্নীকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি, গণমাধ্যমে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

গ্লোবাল টিভির হেড অব নিউজ নাজনীন মুন্নীকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি সংক্রান্ত সংবাদ


 দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে আবারও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের হেড অব নিউজ নাজনীন মুন্নীকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একদল তরুণের বিরুদ্ধে। তাঁরা নিজেদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য পরিচয় দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

ঘটনাটি ইতোমধ্যে সাংবাদিক মহলে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গণমাধ্যমে নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

কার্যালয়ে গিয়ে সরাসরি হুমকির অভিযোগ

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের কার্যালয়ে গিয়ে কয়েকজন তরুণ কর্তৃপক্ষকে হুমকি দেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় বলেন—নাজনীন মুন্নীকে চাকরিচ্যুত না করলে অফিসে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে

উল্লেখ্য, এর আগে ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যা দেশের গণমাধ্যমে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।

নাজনীন মুন্নীর বর্তমান দায়িত্ব ও পেশাগত পটভূমি

নাজনীন মুন্নী বর্তমানে গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের হেড অব নিউজ হিসেবে কর্মরত। তিনি চলতি বছরের জুলাই মাসে এই চ্যানেলে যোগ দেন। এর আগে তিনি ডিবিসি নিউজ চ্যানেলে অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি সংবাদ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশ

হুমকির ঘটনার পর নাজনীন মুন্নী নিজের ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লেখেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর শাখা কমিটির নাম ব্যবহার করে ৭–৮ জন তরুণ তাঁর অফিসে গিয়ে হুমকি দিয়ে গেছে

তাঁর ভাষায়, চাকরি না ছাড়লে গ্লোবাল টিভির কার্যালয়েও প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মতো আগুন ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

এই পোস্টের পর বিষয়টি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে শুরু করে।

নাজনীন মুন্নীর প্রতিক্রিয়া

ঘটনার বিষয়ে নাজনীন মুন্নী বলেন, তিনি মনে করেন এটি গণমাধ্যমের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের অংশ। তাঁর ভাষায়, সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার একটি চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, “বারবার রাজনৈতিক চাপ ও হুমকির মুখে পড়ছি। আগে ডিবিসি ছাড়তে হয়েছিল, এখন আবার নতুন করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমি চুপ থাকব না।”

তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি।

ঘটনার সময় কী ঘটেছিল?

নাজনীন মুন্নীর বর্ণনা অনুযায়ী, ২১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তিনি অফিসে রিপোর্টারদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। রাত আটটার দিকে তিনি অফিস থেকে বের হয়ে গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় যান।

এই সময়েই ৭–৮ জন তরুণ গ্লোবাল টিভির অফিসে প্রবেশ করেন। তাঁরা এর আগে চ্যানেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহমেদ হোসেনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন, তবে আসার উদ্দেশ্য পরিষ্কার করেননি।

অফিসে এসে তাঁরা প্রথমে কিছু সংবাদ কাভারেজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে আলোচনা ঘুরে যায় নাজনীন মুন্নীর চাকরির বিষয়ে।

চাকরিচ্যুত করার দাবি ও লিখিত প্রতিশ্রুতি চাওয়া

নাজনীন মুন্নীর ভাষ্যমতে, তরুণেরা এমডিকে বলেন—
“নাজনীন মুন্নী আওয়ামী লীগের লোক। তাঁকে রাখা যাবে না। তাঁকে বাদ দিতে হবে।”

এমডি আহমেদ হোসেন তাঁদের জানান, নাজনীন মুন্নীকে যাচাই-বাছাই করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই।

তবে তরুণেরা এতে সন্তুষ্ট হননি। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নাজনীন মুন্নীকে চাকরিচ্যুত করার লিখিত প্রতিশ্রুতি চেয়ে একটি কাগজে সই করাতে চান।

এমডি ওই কাগজে সই করতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে নাজনীন মুন্নীর অভিযোগ।

অগ্নিসংযোগের হুমকির অভিযোগ

নাজনীন মুন্নী দাবি করেন, ওই সময় তরুণেরা বলেন—
“প্রথম আলো-ডেইলি স্টারও কিছু করতে পারেনি। আপনারা তো কিছুই না। আমাদের কথা না শুনলে এখানেও আগুন লাগবে।”

এই বক্তব্য গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বক্তব্য

ঘটনা নিয়ে আলোচনার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রিফাত রশীদ (রশিদুল ইসলাম) এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।

তিনি বলেন, মহানগর কমিটির পৃথু নামের এক সদস্য কেন্দ্রীয় অনুমতি ছাড়াই কয়েকজনকে নিয়ে গ্লোবাল টিভিতে গিয়েছিলেন। সেখানে একটি স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল।

রিফাত রশীদ দাবি করেন, স্মারকলিপিতে আগুন লাগানোর কোনো কথা লেখা ছিল না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট সদস্যকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা গণমাধ্যমের ওপর কোনো হামলার পক্ষে নই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংগঠনটির অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গত বছরের জুলাই–আগস্ট অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরে এই প্ল্যাটফর্ম ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠিত হয়।

এরপর কিছু সময় সংগঠনটির দৃশ্যমান কার্যক্রম কমে গেলেও নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনার অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। এ প্রেক্ষাপটে ২৫ জুন ভোটের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠিত হয়

গ্লোবাল টিভি কর্তৃপক্ষের অবস্থান

ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে গ্লোবাল টিভি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হোসেন গণমাধ্যমে মন্তব্য করতে রাজি হননি

তবে নাজনীন মুন্নীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর তাঁকে কিছুদিন অফিসে না আসতে বলা হয়েছিল এবং বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে অনুরোধ করা হয়।

সাংবাদিক মহলের উদ্বেগ

এই ঘটনার পর দেশের সাংবাদিক সংগঠন ও পেশাজীবী মহলে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, গণমাধ্যমে এভাবে হুমকি ও চাপ সৃষ্টি হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।

উপসংহার

সব মিলিয়ে গ্লোবাল টিভির হেড অব নিউজ নাজনীন মুন্নীকে চাকরিচ্যুত করার হুমকির ঘটনা দেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এটি শুধু একজন সাংবাদিকের বিষয় নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত

এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ঘটনায় কী পদক্ষেপ নেয় এবং ভবিষ্যতে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

Post a Comment

0 Comments

//