মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলায় মঙ্গলবার সকালে ঘটে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যেখানে দুই যুবক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। নিহতরা হলেন রিয়াদ আহমদ (২২) ও জাবেদ আহমদ (২০)। ঘটনার সময় তারা নতুন কেনা একটি মোটরসাইকেলে ঘন কুয়াশার মধ্যে কুলাউড়া এলাকার আছুরিঘাট এলাকায় যাচ্ছিলেন। বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ফল বহনকারী পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে এই দুই বন্ধু ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
দুর্ঘটনার খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে কুলাউড়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে। কুলাউড়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুহিত মিয়া প্রথম আলোকে জানান, “ঘন কুয়াশার কারণে পথের দৃশ্যমানতা সীমিত ছিল। এই অবস্থায় পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।”
নিহতদের পরিচয় ও পটভূমি
নিহত রিয়াদ আহমদ জুড়ী উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং ফল ব্যবসায়ী নুরু মিয়ার ছেলে। তিনি উপজেলা সদরের শিশুপার্ক চত্বরে তাঁর বাবার ফলের দোকান পরিচালনা করতেন। অপর নিহত জাবেদ আহমদ একই উপজেলার জাঙ্গিরাই এলাকার মৃত দিলু মিয়ার ছেলে। জাবেদ সম্প্রতি উপজেলা সদরের কামিনীগঞ্জ বাজারে একটি কাপড়ের দোকান খুলেছিলেন।
দু’দিন আগে রিয়াদ একটি পুরোনো মোটরসাইকেল কিনেছিলেন ৭০ হাজার টাকায়। মঙ্গলবার সকালে তিনি জাবেদকে সঙ্গে নিয়ে কুলাউড়ার দিকে যাচ্ছিলেন। ঘটনার সময় ঘন কুয়াশার কারণে পথের দৃশ্যমানতা অত্যন্ত সীমিত ছিল।
দুর্ঘটনার পরিস্থিতি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মোটরসাইকেলটি আছুরিঘাট এলাকায় পৌঁছানোর সময় বিপরীত দিক থেকে আসা পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষ এতই তীব্র ছিল যে, ঘটনাস্থলেই দুই আরোহীর মৃত্যু হয়। স্থানীয়রা এবং পুলিশ জানাচ্ছেন, দুর্ঘটনার সময় ভ্যানের চালক যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন, তবে ঘন কুয়াশা এবং সড়কের সীমিত দৃশ্যমানতার কারণে ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয় মানুষ এবং স্বজনরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে। নিহত রিয়াদের বাবা নুরু মিয়া বলেন, “সকালে সে দোকান খোলার জন্য বের হয়েছিল। জানতাম না সে বেড়াতে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য বাইরেও বের হওয়া, তার জীবন শেষ করে দিয়েছে। এ কষ্ট সহ্য করা যায় না।”
নিহত জাবেদের পরিবারের সদস্যও জানান, “আমরা কখনো ভাবতে পারিনি যে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পরিবারের সব পরিকল্পনা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে।”
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পর স্থানীয়রা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ান। কুলাউড়া থানার পুলিশ সহ বিভিন্ন স্থানীয় নেতৃত্ব পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করেন। দুর্ঘটনার পর কুলাউড়া-বড়লেখা আঞ্চলিক সড়কের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। স্থানীয়রা বলেন, ঘন কুয়াশার কারণে চলাচল বেশ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং সড়ক চিহ্ন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “প্রতিটি বছরের শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশা হয়। তবে এবার শীত এবং কুয়াশার তীব্রতা অতিরিক্ত। এই কারণে দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি বেড়ে গেছে। চলাচলের সময় বাড়তি সতর্কতা নেওয়া উচিত।”
পুলিশি পদক্ষেপ
পুলিশ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য সংগ্রহ করছে। কুলাউড়া থানার এসআই মুহিত মিয়া বলেন, “ঘন কুয়াশা এবং সীমিত দৃশ্যমানতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
পুলিশের সঙ্গে স্থানীয় সড়ক পরিবহন কর্মকর্তারা ও যানবাহন চালকদের জন্য সতর্কতা প্রদান করেছেন। স্থানীয়রা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, প্রশাসন আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিলে ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা কম হবে।
সড়ক নিরাপত্তা এবং সচেতনতা
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া-বড়লেখা আঞ্চলিক সড়ক ঘন কুয়াশা এবং শীতের সময় বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সকালে এবং সন্ধ্যার সময় দৃশ্যমানতা সীমিত থাকে। এই ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে সড়কে হাইওয়ে সাইন, রিফ্লেকটিভ মার্কার এবং সঠিক লাইট ব্যবহারের নির্দেশনা প্রদান করা প্রয়োজন।
স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ জনগণকে সচেতন করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এছাড়া, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য পরিবার ও স্থানীয় কমিউনিটি সচেতনতার উদ্যোগ নিচ্ছে।
পরিবার ও কমিউনিটির প্রতিক্রিয়া
নিহতদের পরিবার মর্মাহত এবং শোকাহত। তারা স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। স্থানীয় কমিউনিটি নেতা এবং প্রতিবেশিরা দুর্ঘটনার স্থানে গিয়ে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দুঃখ ভাগাভাগি করেছেন।
নিহতদের বন্ধু ও প্রতিবেশিরা বলছেন, “রিয়াদ ও জাবেদ ছিলেন খুবই বন্ধুসুলভ এবং দায়িত্বশীল যুবক। এ ধরনের দুর্ঘটনা তাদের পরিবারের জন্য এক অল্প-কালীন নয়, দীর্ঘকালীন শোক। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিক।”
উপসংহার:
মৌলভীবাজারে ঘটেছে একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যেখানে দুই যুবকের জীবন শেষ হয়ে গেছে। ঘন কুয়াশা ও সীমিত দৃশ্যমানতার কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং কমিউনিটি সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করা হচ্ছে।
0 Comments
আপনার মতামত দিন!