মেট্রোরেল সেবায় ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়াল এনবিআর

 

মেট্রোরেলের টিকিটে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়িয়েছে এনবিআর


রাজধানীবাসীর দৈনন্দিন যাতায়াতে স্বস্তির খবর দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মেট্রোরেল সেবায় টিকিটের ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অব্যাহতির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়েছে। ফলে যাত্রীরা আগের মতোই ভ্যাট ছাড়াই মেট্রোরেলে ভ্রমণ করতে পারবেন।

এনবিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, জনস্বার্থ বিবেচনায় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেট্রোরেল টিকিটে ভ্যাট অব্যাহতি বহাল থাকবে।

আগের মেয়াদ ও নতুন সিদ্ধান্ত

এর আগে এনবিআর মেট্রোরেল টিকিটে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দিয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই সরকার এই সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মেট্রোরেল একটি গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা। রাজধানীর যানজট কমানো, যাত্রীদের সময় ও খরচ সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতেই এই ভ্যাট অব্যাহতি অব্যাহত রাখা হয়েছে।

উপদেষ্টা পরিষদের সিদ্ধান্তের আলোকে প্রজ্ঞাপন

গত ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে মেট্রোরেলের টিকিটে ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এনবিআর মঙ্গলবার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করে।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, মেট্রোরেল এখনও উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের পর্যায়ে রয়েছে। এই অবস্থায় ভ্যাট আরোপ করলে যাত্রীভাড়া বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত, যা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করত।

ভ্যাট আইন কী বলে?

বর্তমান ভ্যাট আইন অনুযায়ী, যেকোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত রেল সেবার টিকিটে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিধান রয়েছে। মেট্রোরেল পুরোপুরি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় আইনগতভাবে এই সেবার ওপর ভ্যাট আরোপের সুযোগ রয়েছে।

তবে মেট্রোরেল একটি গণপরিবহন ব্যবস্থা হওয়ায় এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় সরকার শুরু থেকেই এই সেবায় ভ্যাট আরোপ থেকে বিরত রয়েছে।

কেন মেট্রোরেলে ভ্যাট আরোপ হয়নি?

মেট্রোরেল চালুর পর থেকেই এর মালিক প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সরকারের কাছে ভ্যাট অব্যাহতির অনুরোধ জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি ছিল—মেট্রোরেলকে জনপ্রিয় ও সবার জন্য সহজলভ্য করতে ভাড়া কম রাখা জরুরি।

এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ও এনবিআর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং একাধিকবার ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়িয়েছে।

ভ্যাট আরোপের উদ্যোগ ও পিছু হটা

২০২৩ সালের শুরুতে এনবিআর মেট্রোরেলের টিকিটে ভ্যাট আরোপের উদ্যোগ নেয়। ওই বছরের ২২ জানুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটের তৎকালীন কমিশনার শওকত আলী সাদী মেট্রোরেল কোম্পানিকে চিঠি দিয়ে ভ্যাট আরোপের আহ্বান জানান।

এরপর এ বিষয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ ও এনবিআরের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে যাত্রীস্বার্থ, সামাজিক প্রভাব ও পরিবহন ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত এনবিআর ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

মেট্রোরেলের বর্তমান অবস্থা

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় মেট্রোরেল একটি যুগান্তকারী সংযোজন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রথম ধাপে মেট্রোরেল চালু হয়। পরবর্তীতে এটি সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে মতিঝিল পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করছে।

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। এতে রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে যাতায়াত আরও সহজ হবে।

যাত্রীদের জন্য কী সুবিধা থাকছে?

ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানোর ফলে যাত্রীরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাচ্ছেন—

  • টিকিটের ভাড়া অপরিবর্তিত থাকছে

  • দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় কম থাকছে

  • নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে না

  • গণপরিবহন ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে

বিশেষ করে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও নিয়মিত যাত্রীদের জন্য এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতামত

অর্থনীতিবিদদের মতে, মেট্রোরেলের মতো গণপরিবহনে ভ্যাট অব্যাহতি একটি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এতে সরাসরি রাজস্ব কিছুটা কমলেও দীর্ঘমেয়াদে যানজট হ্রাস, সময় সাশ্রয় ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তাঁরা মনে করেন, মেট্রোরেল পুরোপুরি লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে ভ্যাট অব্যাহতি বজায় রাখাই যুক্তিযুক্ত।

ভবিষ্যতে ভ্যাট আরোপ হবে কি?

এ বিষয়ে এনবিআর বা সরকার এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মেট্রোরেল যখন পুরোপুরি চালু হবে এবং যাত্রীসংখ্যা ও আয় স্থিতিশীল পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন ভ্যাট আরোপের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনায় আসতে পারে।

তবে আপাতত ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত যাত্রীদের এ বিষয়ে চিন্তার কোনো কারণ নেই।

জনস্বার্থে সরকারের অবস্থান

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, মেট্রোরেল একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে রাজধানীর যানজট কমানো এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রা সহজ করাই মূল লক্ষ্য।

ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানো সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেরই একটি অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপসংহার

সব দিক বিবেচনায় মেট্রোরেল সেবায় ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যাত্রীবান্ধব ও জনস্বার্থমূলক। এতে রাজধানীবাসী যেমন আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন, তেমনি গণপরিবহন ব্যবহারে আগ্রহও বাড়ছে।

২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ভ্যাট ছাড় অব্যাহত থাকায় মেট্রোরেল যাত্রীদের জন্য স্বস্তি বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Post a Comment

0 Comments

//