বাংলাদেশের বিচার বিভাগের শীর্ষ পদে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই নিয়োগের তথ্য জানানো হয়।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান বিচারপতি হিসেবে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নিয়োগ শপথ গ্রহণের তারিখ থেকে কার্যকর হবে। প্রজ্ঞাপনের তারিখ ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ হলেও এটি প্রকাশ করা হয় পরদিন বুধবার।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতায় নিয়োগ
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রজ্ঞাপনে মঙ্গলবারের তারিখ থাকলেও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এটি বুধবার প্রকাশ করা হয়। নিয়োগের বিষয়টি ইতোমধ্যে বিচার বিভাগ ও আইন অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিদায়ী প্রধান বিচারপতির অবসর ও নতুন নেতৃত্ব
বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ সংবিধান অনুযায়ী অবসরের পথে রয়েছেন। বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর। সৈয়দ রেফাত আহমেদের জন্ম ১৯৫৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর। সে হিসেবে তাঁর বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হবে আগামী ২৭ ডিসেম্বর।
এই প্রেক্ষাপটে বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে গত বছরের ১১ আগস্ট প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর মেয়াদ কতদিন?
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর জন্ম ১৯৬১ সালের ১৮ মে। সংবিধান অনুযায়ী অবসরের বয়স ৬৭ বছর হওয়ায় তিনি ২০২৮ সালের ১৮ মে অবসর গ্রহণ করবেন।
সে হিসেবে প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁর হাতে থাকবে প্রায় সাড়ে দুই বছরের মতো সময়। এই সময়ের মধ্যে বিচার বিভাগের সংস্কার, মামলার জট নিরসন ও বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পারিবারিক পরিচয় ও শৈশব
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী একটি বিচারিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা প্রয়াত বিচারপতি এ এফ এম আবদুর রহমান চৌধুরী এবং মা বেগম সিতারা চৌধুরী। পারিবারিকভাবে আইন ও বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের পরিচয় রয়েছে।
আইন অঙ্গনে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পারিবারিক এই পটভূমি তাঁর বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাগত মানসিকতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শিক্ষাজীবন ও আন্তর্জাতিক ডিগ্রি
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী তাঁর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি এখান থেকে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে এলএলএম সম্পন্ন করেন।
দেশি ও আন্তর্জাতিক আইন শিক্ষায় দক্ষতা অর্জনের ফলে তাঁর বিচারিক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক মান ও আইনি ব্যাখ্যার প্রতিফলন দেখা যায় বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন।
আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ১৯৮৫ সালে জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। দুই বছর পর, ১৯৮৭ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘদিন তিনি দেওয়ানি, ফৌজদারি ও সাংবিধানিক বিষয়ে মামলা পরিচালনা করেন। তাঁর পেশাগত দক্ষতা ও সততার কারণে তিনি আইন অঙ্গনে ধীরে ধীরে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।
বিচারক হিসেবে পদোন্নতির ধাপ
বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর বিচারিক ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট, যখন তিনি হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। দুই বছর পর, ২০০৫ সালের ২৭ আগস্ট তিনি হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হন।
দীর্ঘ সময় হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন। আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালনের এক বছরের মধ্যেই তিনি দেশের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন, যা তাঁর পেশাগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
আইন অঙ্গনের প্রত্যাশা
নতুন প্রধান বিচারপতির নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছে দেশের আইন অঙ্গনের বিভিন্ন সংগঠন ও সিনিয়র আইনজীবীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে বিচার বিভাগ আরও স্বাধীন, কার্যকর ও জনবান্ধব হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কমানো, ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থার বিস্তৃতি এবং বিচারিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
বিচার বিভাগের সামনে চ্যালেঞ্জ
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো মামলার জট। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত পর্যন্ত লাখো মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নতুন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমন প্রত্যাশা সাধারণ মানুষেরও।
এ ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও নতুন প্রধান বিচারপতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
উপসংহার
সব মিলিয়ে, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ বাংলাদেশের বিচার বিভাগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ বিচারিক অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী শিক্ষাগত পটভূমি এবং পেশাগত সততার কারণে তাঁর কাছ থেকে ইতিবাচক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছে দেশবাসী।
শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলে বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ পথচলা কোন দিকে যায়, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
0 Comments
আপনার মতামত দিন!